ভাটিয়ারির ফেরদৌস স্টিল কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে নিভে গেল ৫ প্রাণ!

কাজে গিয়ে আর ফেরা হলো না সানি-পলাশ-মনসুর-নাসিরদের

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:১৫

উপকূলের আকাশজুড়ে তখন ইলিশ ধরার ব্যস্ত সকাল। জাল গুটিয়ে ঘাটে ফেরার আকুলতা জেলেদের চোখেমুখে। অথচ সেই সকালেই সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারির উপকূলীয় বাতাসে হঠাৎ নেমে এল এক নিঃশব্দ হাহাকার।

কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাস মুহূর্তে কেড়ে নিল পাঁচ শ্রমিকের তাজা প্রাণ।

আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন-ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)।

একই পরিবারের দুই ভাই আর প্রতিবেশীদের এমন অকালপ্রয়াণে পুরো ভাটিয়ারি এলাকায় এখন শোকের মাতম। দুর্ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও অন্তত তিন শ্রমিক।

সাগরের বাতাস ভারী করল বিষাক্ত গ্যাস

ঘটনার ভয়াবহতা কতটা তীব্র ছিল, তা বোঝা যায় স্থানীয় জেলেদের বর্ণনায়। কারখানাটির ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের গন্ধে বিষাক্ত হয়ে ওঠে আশপাশের বাতাস।

সাগরে ইলিশ ধরে ফেরা জেলেরা বিষাক্ত ঝাঝালো গন্ধে কারখানার পাশের খালে নৌকা ভেড়াতে ব্যর্থ হন। প্রাণ বাঁচাতে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ঘাটে নোঙ্গর করতে হয় তাঁদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে কান্নার চিৎকার শুনি। গিয়ে দেখি অসুস্থ কয়েকজনকে তড়িঘড়ি গাড়িতে তোলা হচ্ছে।

পরে যখন খবর ছড়ায় জাহাজের ভেতরেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে কয়েকজন মারা পড়ে আছেন, তখন স্থানীয়দের আর ধরে রাখা যায়নি।

দুর্ঘটনার খবরে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা কারখানায় ঢুকে প্রতিবাদ জানালে কিছু সময় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

অসতর্কতা নাকি সুরক্ষার ঘাটতি?

কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন মুঠোফোনে জানান, তিনি দুর্ঘটনাস্থলের বাইরে ছিলেন। তবে কারখানার তথ্যসূত্রে তিনি জেনেছেন, জাহাজে থাকা একটি বিষাক্ত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে অসতর্কতাবশত কর্মী আক্রান্ত হন।

এতে চার থেকে পাঁচজন মারা গেছেন এবং তিনজন আহত হয়েছেন। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তিনি কারখানায় যাচ্ছেন বলে জানান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম জানান, কারখানাটি থেকে ছয়জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল।

তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

ভাটিয়ারির এই মৃত্যুপুরী আবারও আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল-জাহাজভাঙা শিল্পের ভারী লোহা লক্কড়ের নিচে আমাদের শ্রমিকদের জীবনের মূল্য কতখানি ভঙ্গুর।

জীবনের তাগিদে জাহাজের বিষাক্ত পেটে নেমে যাওয়া এই মানুষগুলোর শেষ নিঃশ্বাস যেন সীতাকুণ্ডের উপকূলে এক ভারী প্রশ্ন রেখে গেল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি