৯ মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই ফের দুর্ঘটনা,জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আরেক শ্রমিক

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩৩

সীতাকুণ্ডের উপকূলে লোহা কাটার বিকট শব্দের পেছনে বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের আর্তনাদ। ভাটিয়ারীতে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের করুণ মৃত্যুর রেশ না কাটতেই, মাত্র দুদিনের ব্যবধানে আবারও রক্তে রঞ্জিত হলো সীতাকুণ্ডের একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।

গ্রিন শিপব্রেকিং তকমা থাকলেও সুরক্ষার চূড়ান্ত অবহেলায় ওপর থেকে পড়া এক খণ্ড ভারী লোহার আঘাতে এবার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন মো. আলাউদ্দিন নামে এক শ্রমিক।

রোববার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার চৌধুরীঘাটা এলাকায় অবস্থিত ‘বারাকা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে’ ঘটে এ নির্মম দুর্ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সকালের শিফটে কাজ করছিলেন সীতাকুণ্ডের কুমিরার বাসিন্দা আলাউদ্দিন। হঠাৎই কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই ওপর থেকে একটি বিশালাকার ভারী লোহা তাঁর ওপর খসে পড়ে।

মুহূর্তেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রামের বেসরকারি ‘ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে’ নিয়ে যান। বর্তমানে আইসিইউতে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

তথ্য গোপনের ব্যর্থ চেষ্টা ও প্রশাসনিক গাফিলতি:
দুর্ঘটনার পর পরই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা চালায় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এ খবর ছড়িয়ে পড়ে।

গত শুক্রবার ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রবিবারের এ ঘটনায় শিপইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিল্প খাতটিতে অব্যাহত গাফিলতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা)’ হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহিন।

তিনি বলেন, ৯ শ্রমিকের প্রাণহানির রক্ত এখনো শুকায়নি, অথচ এর দুদিনের মাথায় আরেকটি তথাকথিত ‘গ্রিন’ ইয়ার্ডে রক্ত ঝরল। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো কতটা উদাসীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। এই শিল্পকে অবিলম্বে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে কঠোর সরকারি নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

দায় এড়িয়ে নীরব কর্তৃপক্ষ:
দুর্ঘটনার আসল কারণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জানতে ‘বারাকা শিপব্রেকিং ইয়ার্ড’ কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সেক্রেটারি মো. নাজমুল ইসলাম ঘটনার আংশিক সত্যতা স্বীকার করে জানান, তিনিও এক শ্রমিক আহত হয়ে ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার বিষয়টি শুনেছেন, তবে এর বিস্তারিত তথ্য তাঁর জানা নেই।

লোহা পুনর্ব্যবহারের এই লাভজনক শিল্প কি তবে শ্রমিকদের জন্য কেবলই এক ‘মৃত্যুকূপ’?

একের পর এক রক্তক্ষরণ ও প্রাণহানির পরও তদারকি সংস্থাগুলোর নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ে আজ প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীরা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি