নকশা লঙ্ঘনের নগরী: এক দিনের অভিযানে কি বদলাবে চট্টগ্রাম?

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬ ২২:১০

কল্পলোক আবাসিক এলাকায় ২ জুলাইয়ের অভিযানে ভেঙে পড়া দেয়ালগুলো শুধু কয়েকটি ভবনের অবৈধ অংশের পতনের প্রতীক নয়, এগুলো যেন দীর্ঘদিনের একটি নগর-বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।

যে বাস্তবতায় অনুমোদিত নকশা কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে, আর বাস্তবে ভবন উঠেছে মালিকের ইচ্ছেমতো।

যে বাস্তবতায় আইন ছিল, কিন্তু প্রয়োগ ছিল বিচ্ছিন্ন, তদারকির দায়িত্ব ছিল, কিন্তু নজরদারি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

চউকের সাম্প্রতিক অভিযান স্পষ্ট করে দিয়েছে—অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রশাসন এখন কঠোর অবস্থানে যেতে চাইছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে।

বছরের পর বছর ধরে নিয়ম ভেঙে নির্মাণ হয়েছে, একের পর এক বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে গেছে, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।

ফলে আজ যখন অবৈধ অংশ ভাঙা হচ্ছে, তখন শুধু ভবন মালিকই নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ছে পুরো তদারকি ব্যবস্থাও।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই নগরীর কল্পলোক আবাসিক এলাকা, কে বি আমান আলী রোড, মোহরা ও কাপ্তাই রাস্তার মাথায় দিনব্যাপী পরিচালিত অভিযানে ১৫টি ভবন পরিদর্শন, সাত ভবনের মালিককে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, চারটি ভবন সিলগালা এবং অন্তত ছয়টি ভবনের অবৈধ অংশ অপসারণ করা হয়েছে।

চউক বলেছে, নগরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভবন মালিক অনুমোদিত প্ল্যান ও বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করেন না।

ভবন মালিকদের অভিযোগ ছিল ভিন্ন—সময়ে তদারকি হলে এত বড় অনিয়মের সুযোগই তৈরি হতো না।

জরিমানা হয়েছে, সিলগালা হয়েছে, কোথাও অবৈধ অংশ ভাঙা হয়েছে; আবার অনেক ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা দুর্বল নজরদারির কারণে অনিয়ম ফিরে এসেছে নতুন রূপে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নির্মাণের শুরু থেকেই কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না করলে শেষ পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়া সম্ভব নয়।

শুধু ভবন নয়, বদলাতে হবে ব্যবস্থাও

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে অভিযানকে সফল করতে হলে কেবল বুলডোজার বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভর করলে হবে না। নির্মাণের প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

অনুমোদিত নকশা অনলাইনে উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষও জানতে পারেন একটি ভবন কত তলা হওয়ার কথা, কোথায় সেটব্যাক থাকবে, কতটুকু জায়গা খালি রাখতে হবে।

একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে শুধু ভবন মালিক নয়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলছেন তারা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। অনেক ভবন মালিক হয়তো আইন জানেন, আবার কেউ কেউ নিয়মকে গুরুত্ব দেন না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিতে হয় পুরো শহরকে। অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় পরিকল্পনাবহির্ভূত ভবনই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

চউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ঘোষণা দিয়েছেন, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়তে অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

যারা স্বেচ্ছায় নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন, এই ঘোষণা কি কেবল কয়েক দিনের অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি নগর সংস্কারের সূচনা হবে?

কারণ পরিকল্পিত নগর শুধু নতুন সড়ক, উড়ালসেতু বা দৃষ্টিনন্দন ভবন দিয়ে তৈরি হয় না।

একটি শহর পরিকল্পিত হয় তখনই, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়, যখন নির্মাণের প্রথম ইট বসানোর দিন থেকেই নজরদারি থাকে।

যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেয়াল ভাঙা নয়—ভাঙতে হবে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা দায়মুক্তির সংস্কৃতি, দুর্বল তদারকির চক্র এবং ‘পরে দেখা যাবে’ মানসিকতাকে।

যদি নির্মাণের প্রথম দিনেই আইন কার্যকর হয়, তাহলে হয়তো আর কোনো দিন কোটি টাকার ভবন ভাঙতে হবে না।

আর যদি আজকের অভিযানও অতীতের মতো কিছুদিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে হয়তো কয়েক বছর পর আবারও কোনো এক সকালে বুলডোজারের শব্দে জেগে উঠবে চট্টগ্রাম—আর একই প্রশ্ন আবারও ফিরে আসবে, “এতদিন কোথায় ছিল নজরদারি?”

এই প্রশ্নের জবাবই নির্ধারণ করবে, ২ জুলাইয়ের অভিযান চট্টগ্রামের নগর ইতিহাসে একটি সাময়িক ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি পরিকল্পিত নগর গঠনের সত্যিকারের মোড় ঘোরানো দিন হিসেবে স্মরণীয় হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি