ফুটবল কখনো কখনো এক বুক ধৈর্যের পরীক্ষা, কখনো আবার এক জাদুকরি মুহূর্তের অপেক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় আজ তেমনই এক স্নায়ুক্ষয়ী পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স।
লাতিন আমেরিকার অদম্য প্রাচীর প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত কষ্টার্জিত জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে ফরাসিরা।
ফরাসিদের ত্রাতা হয়ে চকমক করে উঠলেন সেই চেনা নায়ক—অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।
প্যারাগুয়ের ডিফেন্স যেন আজ চীনের প্রাচীরকেও হার মানাতে চেয়েছিল। ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলে মনে হবে এক গোলবন্যার ম্যাচ, কিন্তু মাঠের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পুরো ম্যাচে ৭৬ শতাংশ বলের দখল রেখে প্যারাগুয়ের গোলমুখে একে একে ১৫টি কামান দেগেছিল ফ্রান্স।
ফরাসিদের নিখুঁত ৫৫২টি পাসের বিপরীতে প্যারাগুয়ে দিতে পেরেছিল মাত্র ১৭৫টি পাস। কিন্তু গোল? ওই যে, ‘গোল’ নামক সোনার হরিণটি কিছুতেই ধরা দিচ্ছিল না।
ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়েকে নিজেদের বক্সে বন্দি করে ফেলে ফ্রান্স। প্রথম ১১ মিনিটেই ফরাসিদের পায়ে বল ছিল ৯০ শতাংশ সময়!
কিন্তু প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরলান্ডো গিল যেন আজ পণ করেছিলেন, শরীর দিয়ে হলেও বল জালে জড়াতে দেবেন না। প্রথমার্ধে টানা সাতটি কর্নার পেয়েও ফরাসি আক্রমণভাগ ভাঙতে পারেনি গিলের তৈরি দুর্গ।
৩১ মিনিটে ওসমান ডেম্বেলের চমৎকার ক্রসে এমবাপ্পের হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ফরাসি গ্যালারিতে কেবলই হতাশার হাহাকার চওড়া হয়।
খেলার উত্তাপ শুধু কৌশলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল খেলোয়াড়দের রক্তেও। ৩৬ মিনিটে আন্দ্রেস কুবাস ফাউল করে বসেন এমবাপ্পেকে। ব্যস, মুহূর্তে শান্ত ফিলাডেলফিয়া যেন রণক্ষেত্র!
ডেম্বেলেসহ দুই দলের খেলোয়াড়দের বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তিতে ছড়াল তুমুল উত্তেজনা। রেফারির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলেও গোলশূন্য প্রথমার্ধ ফ্রান্সের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট করে তোলে।
দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের একই ধার বজায় রাখে ফ্রান্স। ৫৫ মিনিটে মানু কোনোয়ের এক দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট বাজপাখির মতো উড়ে গিয়ে রক্ষা করেন প্যারাগুয়ে কিপার গিল।
তবে এর পরেই ইনজুরির আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় প্যারাগুয়ের চাকা। ৫৮ মিনিটে ওমার আলদেরেতে এবং ৬১ মিনিটে মাঠ ছাড়েন হুলিও এনসিসো।
বদলি হিসেবে নামেন হোসে কানালে ও গুস্তাভো কাবায়েরো। একই সময়ে ফ্রান্সও আক্রমণ আরও ধারালো করতে ব্র্যাডলি বারকোলার জায়গায় নামায় তরুণ তুর্কি দেজিরে দুয়েকে।
আর এই বদলি খেলোয়াড়ই বদলে দিলেন ম্যাচের ভাগ্য। ৬৭ মিনিটে প্যারাগুয়ের ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হন দেজিরে দুয়ে।
রেফারি প্রথমে এড়িয়ে গেলেও ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে বাধ্য হন। ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা।
৭০তম মিনিটে স্পটকিক নিতে এলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ঠান্ডা মাথার এক নিখুঁত শটে পরাস্ত করলেন এতক্ষণের দুর্ভেদ্য দেয়াল অরলান্ডো গিলকে। ১-০! গ্যালারিতে তখন ফরাসিদের উল্লাস।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের সপ্তম গোলটি করে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসলেন এমবাপ্পে।
গোল খেয়ে আর হারানোর কিছু ছিল না প্যারাগুয়ের। শেষ দিকে তারা মরণকামড় দেয়। ৯০ মিনিটে মৌরিসিওর এক কামানের মতো দূরপাল্লার শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দিয়ে ফ্রান্সের ডেঞ্জার-ম্যান বনে যান গোলরক্ষক মাইক মেনিয়ান।
অতিরিক্ত ১০ মিনিটের যোগ করা সময়ে এমবাপ্পে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ৯৬ মিনিটে তাঁর টানা দুটি শট রুখে দিয়ে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিল প্রমাণ করেন—হারলেও তারা মাথা নত করে হারেননি।
শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের স্নায়ুচাপ আরও একবার মাঠে ছড়ালেও, তা বড় কোনো রূপ নেয়নি। ১-০ গোলের এই জয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাঠ ছাড়ে দেশমের শিষ্যরা।
কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের সামনে এবার মরক্কো। যারা অন্য ম্যাচে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফরাসিদের জন্য এক কঠিন হুঙ্কার ছেড়ে রেখেছে।
মরক্কোর আটলান্টিক প্রাচীর ভাঙতে এমবাপ্পেরা কতটা প্রস্তুত, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

