সকাল থেকেই আকাশ ভেঙে নামছিল বৃষ্টি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃষ্টি রূপ নেয় এক নির্মম বাস্তবতায়।
জলজটের চেনা ক্ষত নিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম যখন ভাসছে, তখন বাদ পড়েনি শহরের লাইফলাইন ও রেলযোগাযোগও।
সাধারণ মানুষের শোবার ঘর থেকে শুরু করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, এমনকি লোহার রেললাইনও আজ তলিয়ে গেছে বৃষ্টির পানিতে।
আর এই জল-যন্ত্রণায় আটকা পড়েছে হাজারো মানুষের গন্তব্য ও স্বপ্ন।
আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তীব্র পানি প্রবাহের কারণে নগরের জান আলী হাট স্টেশনে দুটি ট্রেন আটকা পড়ে। আকস্মিক এই রেল বিপর্যয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নগরের ষোলশহর থেকে জান আলী হাট রুটে অতিরিক্ত পানির কারণে রেললাইন পুরোপুরি তলিয়ে যায়।
পানির উচ্চতা লাইনের ওপরে চলে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এর ফলে ঢাকা থেকে সকাল সাড়ে ৬টায় ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ জান আলী হাট স্টেশনে এসে থমকে দাঁড়ায়।
চারদিকের থইথই পানির কারণে ট্রেনটি আর সামনে এগোতে পারেনি। অন্যদিকে, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি দুর্ঘটনা।
রেললাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ার কারণে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে আসা “প্রবাল এক্সপ্রেস” ট্রেনটিকে পথিমধ্যে দোহাজারী রেলওয়ে স্টেশনে আটকে দেওয়া হয়।
প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতর দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকা যাত্রীরা ক্ষোভ ও ক্লান্তির কথা জানিয়ে বলেন, “সকাল সাড়ে দশটার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সময়ে পৌঁছে যাব। কিন্তু রেললাইনে অতিরিক্ত পানি ওঠায় ট্রেন আর সামনে এগোতে পারছে না।
দীর্ঘক্ষণ ধরে এখানে আটকে আছি, চারদিকে পানি। কখন পৌঁছাব, কেউ বলতে পারছে না।”
শত শত যাত্রীর চোখে-মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন-কবে শেষ হবে এই জল-বন্দী দশা?
এদিকে নগরের ভেতরের চিত্র আরও ভয়াবহ। টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নগরের নিচু এলাকার বহু বাসাবাড়ি। শুধু তা-ই নয়, রেহাই পায়নি হাসপাতালও।
চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের হাঁটুপানি মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা নগরের সেবামূলক ব্যবস্থাকে একপ্রকার অচল করে দিয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবুজাফর মজুমদার বলেন, “টানা বৃষ্টিতে রেললাইন তলিয়ে যাওয়ার কারণে জান আলী হাট স্টেশনে ট্রেন আটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।
যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায়। তবে আশার কথা হলো, এখন পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আশা করছি কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে।”
বিকেলের দিকে পানির তীব্রতা কিছুটা কমলেও, জলজটের এই ক্ষত সহজে শুকোবার নয়। প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামের এই চেনা রূপ আর নাগরিকদের এমন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ যেন এক অন্তহীন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃতির মারের পাশাপাশি নগরের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

