আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় সদস্যের লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে গোটা ব্যবস্থার ওপর জনমানুষের আস্থা টলিয়ে দেয়, তার এক শিহরণ জাগানো দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম নগরের সিটি গেট চেকপোস্টে।
কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা এক নৈশকোচ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি বেওয়ারিশ ব্যাগ, অন-ডিউটি রোস্টারের গরমিল, সিসিটিভি ফুটেজের অকাট্য তথ্য আর পরবর্তীতে পুলিশের নাটকীয় বয়ান পরিবর্তন-সব মিলিয়ে এক গভীর চক্রের সন্ধান মিলছে।
অভিযোগ উঠেছে, একটি বড় অংকের মাদকের চালান নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার পর তা আত্মসাৎ করে দায় এড়াতে সাজানো হয়েছে মাত্র ৪শ পিস ইয়াবা জব্দের এক দুর্বল গল্প।
১২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের সেই অকাট্য দলিল
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ জুন বিকেলে। চট্টগ্রাম নগরের প্রবেশমুখ সিটি গেটে কক্সবাজার থেকে ঢাকা অভিমুখী সোহাগ পরিবহনের একটি স্ক্যানিয়া বাস এসে থামে।
তল্লাশির একপর্যায়ে বাসের নিচে থাকা লাগেজ বক্স থেকে একটি খয়েরি রঙের বড় ব্যাগ বের করা হয়। বাসের টিকিট ও সিট নম্বর অনুযায়ী নির্ধারিত যাত্রীকে বাসে পাওয়া যায়নি-তিনি কৌশলে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন।
ঘটনাস্থলের ঠিক পাশেই থাকা একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরায় বন্দি হওয়া ১২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটে বাসটি থামার পর সন্ধ্যা ৬টা ১ মিনিটে ব্যাগটি নিচে নামানো হয়।
বাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাগের মালিককে খুঁজে না পেয়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানান।
এরপর ব্যাগের নিয়ন্ত্রণ নেন আকবরশাহ থানার এএসআই আরিফ। ফুটেজে তাঁর পাশাপাশি এসআই সাজ্জাদ ও এএসআই মেজবাহ উদ্দিনকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ সরকারি ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী, ওই নির্দিষ্ট সময়ে এএসআই আরিফের সিটি গেট চেকপোস্টে কোনো ডিউটিই ছিল না।
ব্যাগ নিয়ে রহস্যময় সফর ও ভুয়া নথির জাল
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তালাবদ্ধ ব্যাগটি উদ্ধার করার পর তা সরাসরি কোনো থানায় বা সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়নি।
প্রথমে ব্যাগটি নগরের একটি আবাসিক হোটেলে এবং পরবর্তীতে আকবরশাহ নন্দন হাউজিংয়ের একটি ব্যক্তিগত বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ব্যাগটি খুলে ভেতরে থাকা আনুমানিক ১ লাখ পিস ইয়াবার একটি বিশাল চালান গায়েব করা হয় বলে অভিযোগ।
ঘটনার দেড় মাস পর যখন পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে বিষয়টি নিয়ে গোপনীয় তদন্ত শুরু হয়, তখনই উন্মোচিত হতে থাকে জালিয়াতির একের পর এক স্তর।
ঘটনার এতদিন পর আকবরশাহ থানা-পুলিশ দাবি করতে শুরু করে, ওই দিন বাসটি থেকে ৪শ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল।
কিন্তু পুলিশ যে জব্দ তালিকা উপস্থাপন করেছে, তাতে সাক্ষী হিসেবে বাসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ হাছানের নাম ও স্বাক্ষর থাকলেও তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে লিখিতভাবে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন-তিনি কোনো জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেননি এবং ব্যাগটি তাঁর সামনে খোলাও হয়নি।
প্রথমদিকে ঘটনাটি পুরোপুরি অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। সিসিটিভি ফুটেজে হাতে ব্যাগ নিয়ে দেখা যাওয়া এএসআই আরিফ প্রথমে দাবি করেন, তিনি ওই সময় কর্নেলহাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পরে বক্তব্য বদলে বলেন, তিনি আসামি ধরতে গিয়ে চেকপোস্টে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, তৎকালীন চেকপোস্ট ইনচার্জ এসআই সাজ্জাদ নিজের ডিউটির বিষয়টি অস্বীকার করলেও নথিপত্রে তাঁর দায়িত্বের প্রমাণ মিলতেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
আকবরশাহ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানও প্রথমে বাস থেকে কোনো ব্যাগ জব্দ বা ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য তাঁর জানা নেই বলে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিলেন।
অথচ তদন্তের আঁচ গায়ে লাগতেই হঠাৎ করেই ৪শ পিস ইয়াবা জব্দের আইনি নথি সামনে আনা হয়। রক্ষকদের এই লুকোচুরি ও অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান মূলত তাঁদের নিজেদের পাতা আইনি জালেই তাঁদের আটকে দিচ্ছে।
আইনি ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি
ঘটনার দিন চেকপোস্টে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও অন-ডিউটি পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি চাকরিচ্যুত কনস্টেবল তারিকুল ইসলাম ও এক রাজনৈতিক সোর্সের উপস্থিতির তথ্য প্রমাণ করে-এই অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল একটি সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা।
সিএমপির পক্ষ থেকে গঠিত সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল বর্তমানে বিষয়টি শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় না দিয়ে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র-আজকের পত্রিকা
তবে জনমনে এখন বড় প্রশ্ন-কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা হাতসাফাই করে ভুয়া নথি তৈরির এই মারাত্মক অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় শাস্তিতেই কি দায় শেষ হবে?
নাকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও জালিয়াতির ধারায় সরাসরি অপরাধী হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে?
অপরাধ দমনকারী সংস্থা যখন নিজেই অপরাধের অংশীদার হয়ে ওঠে, তখন কঠোরতম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই কেবল হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

