চউকে নিয়োগ-জালিয়াতির পর্দাফাঁস: নিয়োগ বোর্ডে ভূত কারা?

এসএসসি পাসে ‘অফিসার’৫ মাস পর বরখাস্ত ৮ পরিদর্শক!

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:০৯

আবেদনপত্র জমা পড়া থেকে শুরু করে লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়া, চূড়ান্ত ফলাফলে নাম ওঠা এবং সবশেষে লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা নিয়োগপত্র-একটি সরকারি চাকরির চিরাচরিত প্রক্রিয়ার সবকটি ধাপই সম্পন্ন হয়েছিল নিখুঁত ও স্বাভাবিক নিয়মে।

তবে এই বাহ্যিক ‘নিয়মতান্ত্রিকতার’ ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক চরম প্রশাসনিক জালিয়াতি ও পুকুরচুরি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ বা চউক) মতো নগর পরিকল্পনার শীর্ষ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় বিজ্ঞাপিত শর্ত ও আইন ভেঙে, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বাগিয়ে নেওয়া হয়েছিল ইমারত পরিদর্শকের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদ।

নিয়োগের দীর্ঘ পাঁচ মাস পর জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অবশেষে সেই অবৈধ আট পরিদর্শককে এক আদেশে চাকরি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গত ৬ আগস্ট চউকের সচিব মাহবুব উল করিম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই বরখাস্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর মাধ্যমে সংস্থাটির প্রশাসনিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভর করা দীর্ঘদিনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের এক বিষাক্ত অধ্যায় প্রকাশ্যে চলে এলো।

অব্যাহতি পাওয়া আট ইমারত পরিদর্শক হলেন-অনয় সিংহ সুজাত (রোল ২০০১২৫), দ্বিন ইসলাম লিমন (২০০১৩২), মো. আবদুর রহমান রিয়াদ (২০০১২৭), তাহমিদুল ইসলাম ইবনুল (২০০২৬২), মো. মাহিদুল হাসান (২০০২২৪), মো. ইকরামুল হক (২০০২৫৬), ইজতিহাদ ইসলাম খান (২০০১৭১) এবং মো. শরিফুল ইসলাম (২০০১৬৮)।

অফিস আদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া নিয়োগপত্রের শর্ত অনুযায়ী যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা এবং তাঁদের যোগদানপত্র চূড়ান্তভাবে গৃহীত না হওয়ায় চউকের চাকরি থেকে তাঁদের বরখাস্ত করা হলো।

শিক্ষাগত যোগ্যতার পারাদল: সার্ভেয়ারের মোড়কে জালিয়াতি

চউকের নিয়োগ বিধিমালা ও বিজ্ঞপ্তির ১৭ নম্বর কলাম অনুযায়ী, ইমারত পরিদর্শকের ১৮টি পদের জন্য প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমান এবং কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ‘সার্ভে ফাইনাল’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।

কিন্তু অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য-ন্যূনতম এইচএসসি পাসের শর্ত তোয়াক্কা না করে স্রেফ এসএসসি পাস করা প্রার্থীদেরও অনায়াসে ইমারত পরিদর্শক পদে বসিয়ে দেওয়া হয়!

এখানেই প্রশ্ন ওঠে-এটি কি নিছকই কোনো প্রার্থীর তথ্য গোপন, নাকি নিয়োগ বোর্ডের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত কোনো অপরাধচিত্র? স্ক্রিনিং কমিটি প্রাক-বাছাইয়েই কীভাবে এই প্রার্থীদের ‘যোগ্য’ হিসেবে সবুজ সংকেত দিল?

২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি তড়িঘড়ি লিখিত পরীক্ষা, ২৫ জানুয়ারি সকালে মৌখিক পরীক্ষা এবং ওই দিনই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ-এই অলৌকিক ‘গতি’ ছিল মূলত জালিয়াতি পাকা করার এক সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান।

এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি নিয়োগপত্র প্রদান, ২২ ফেব্রুয়ারি যোগদান এবং ৯ মার্চ তাঁদের অথরাইজেশন শাখায় পদায়ন পর্যন্ত সম্পন্ন করে তৎকালীন সিন্ডিকেট।

চার মাস ফাইল চেপে রাখা ও অদৃশ্য তদবিরের খেলা

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গত ২ এপ্রিল চউকের বোর্ডসভাতেই এই আট পরিদর্শককে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু বোর্ডের সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগে যায় দীর্ঘ চার মাস!

অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডে জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী চক্র ওই অবৈধ কর্মকর্তাদের চাকরি বৈধ করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ ও কোটি টাকার তদবির মিশন অব্যাহত রেখেছিল।

মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ও চতুর্মুখী চাপে বাধ্য হয়ে অবশেষে ৬ আগস্ট সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে চউক প্রশাসন।

দীর্ঘ পাঁচ মাস দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করলেও ক্ষমতার দাপটে অবৈধভাবে ঢোকা এই আটজন শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারি বেতন-ভাতা পাননি।

তৎকালীন চেয়ারম্যানের ‘স্বচ্ছতা’ এবং গায়েবি তদন্ত কমিটি

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি জন্মলগ্ন থেকেই ছিল কলঙ্কিত। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই পদের বিনিময়ে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ ও অযোগ্যদের বসার সুযোগ করে দেওয়ার জোরালো অভিযোগ উঠেছিল।

আদালত কর্তৃক একাধিক নিষেধাজ্ঞা, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ ও গণমাধ্যমে খবরের পরও অদৃশ্য শক্তিবলে তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম সবকিছুকে ‘শতভাগ স্বচ্ছ’ বলে দাবি করে জালিয়াতি ধামাচাপা দিয়েছিলেন।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এক রহস্যময় কারণে কোনো তদন্ত প্রতিবেদনই কোনোদিন জনসমক্ষে আনা হয়নি। বর্তমান সরকার ও চউকের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে।

ইতিপূর্বে বিষয়টিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে চউকের অর্থ ও প্রশাসন সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লাহ নুরী বলেছিলেন, প্রার্থীর চাহিত যোগ্যতা না থাকলে তো পরীক্ষায় অংশগ্রহণেরই সুযোগ থাকার কথা নয়। এরপরেও যদি এমন ঘটে থাকে, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মূল আসামিরা আড়ালে: তদন্ত শুরু করবে কি মন্ত্রণালয়?

নিয়োগের এই জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার পর শুধু আটজনকে বরখাস্ত করেই কি দায় এড়াতে পারে চউক প্রশাসন?

নগরবাসীর নিরাপত্তা ও হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো তদারকির দায়িত্বে থাকে যে ‘ইমারত পরিদর্শক’ পদ, সেখানে অযোগ্যদের বসিয়ে মূলত পুরো চট্টগ্রাম শহরকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

চট্টগ্রামবাসীর প্রশ্ন-এসএসসি পাস প্রার্থীর ফাইল স্ক্রিনিং কমিটি থেকে শুরু করে লিখিত ও ভাইভা বোর্ডে অনুমোদিত হলো কীভাবে?

ভাইভা বোর্ডের যেসব কর্মকর্তা যোগ্যতাহীন প্রার্থীদের ‘উপযুক্ত’ বলে নম্বর দিলেন, সেই ‘ভূত’দের পরিচয় কী?

বিগত দিনে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়া তদন্ত কমিটিগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন গোপন রাখার নেপথ্যে কারা ছিল?

কেবল বলির পাঁঠা বানিয়ে আট পরিদর্শককে বরখাস্ত করাই শেষ কথা হতে পারে না। এই মহাজালিয়াতির পেছনে থাকা প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র, নথি অনুমোদনকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নিয়োগ বোর্ডের মূল কারিগরদের চিহ্নিত করতে অবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় বা স্বাধীন দুদক তদন্ত শুরু হওয়া জরুরি।

অন্যথায়, চউকের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর জনমানুষের আস্থা চিরতরে ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি