কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূকম্পনে লন্ডভন্ড চারপাশ:১৩২ মৃত্যু, ৫৭০ আহত

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:২৪

প্রকৃতির এক আকস্মিক ও নির্দয় আঘাতে মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল পুরো একটি অঞ্চল। সোমবার স্থানীয় সময়ে ৭.৪ মাত্রার এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চল।

কলম্বিয়া ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, চলতি শতাব্দীতে দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প।

এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন ৫৭০ জন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, দেশটির রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত চোকো অঞ্চলের ‘সান হোসে দেল পালমার’-এর কাছাকাছি ছিল এর উৎপত্তিস্থল।

ভূগর্ভের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্ট এই কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে তা পার্শ্ববর্তী দেশ ইকুয়েডর ও পানামাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। মূল কম্পনের পর পরবর্তী কয়েক ঘণ্টাতেই অন্তত ২১টি আফটারশক বা পরাঘাতে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে কলম্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, শহরটিতে অন্তত ২০টি বহুতল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং প্রায় ৩৮০টি ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভীতিপ্রদ সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে হোর্হে মোনকায়ো নামে এক ট্যাক্সিচালক বলেন, কম্পনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে চারদিকে শুধু ধুলার মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। জীবনে এমন বিভীষিকা আগে কখনো দেখিনি।

অন্য এক বাসিন্দা হুয়ান কার্লোস ওসোরিওর ভাষায়, ভবনগুলো যখন ভেঙে পড়ছিল, সেই শব্দ ছিল ঠিক শক্তিশালী কোনো বোমা বিস্ফোরণের মতো।

নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় এমন এক ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি হলেন। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি অবিলম্বে দেশজুড়ে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।

প্রেসিডেন্ট এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেন, আমাদের এই মুহূর্তের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য-মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া প্রতিটি প্রাণকে দ্রুত উদ্ধার করা।

বর্তমানে কালিসহ ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও খালি হাতে ও প্রাণের দায়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজে লড়ছেন। নিখোঁজ স্বজনদের সনাক্ত করতে খোলা হয়েছে ডিজিটাল ডেটাবেজ, যেখানে সোমবার বিকেল পর্যন্ত অন্তত ১,৪০০ মানুষের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পেরেইরা, মানিজালেস ও কিবদোসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

কলম্বিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয় বা ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি ভূ-কম্পনপ্রবণ দেশ। তবে ১৯৯৯ সালের পর এত বড় ধাক্কা আর আসেনি। এই সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া মেক্সিকো, চিলি, এল সালভাদর, ইসরায়েল ও ফ্রান্সসহ একাধিক দেশ কলম্বিয়ার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও উদ্ধার অভিযান অবিরত চলছে। স্বজনহারাদের কান্না আর নিখোঁজদের খোঁজে হাহাকারে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

ধসে পড়া ইটের স্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে এই লড়াই, ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি