একদিনের ক্যাজুয়াল সাইট ভিজিটে বোট আর গাড়ি ভাড়ার অছিলায় পকেটস্থ হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেইমপ্লেট কিংবা প্রধান গেটের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর মুখই দেখেনি, অথচ প্রকৌশলীদের তোয়াক্কা না করে নথিপত্রে ভুয়া স্বাক্ষর বসিয়ে আগাম তুলে নেওয়া হয়েছে ৩৯ লাখ টাকা।
এটি কোনো রূপকথা কিংবা রোমাঞ্চকর উপন্যাসের গল্প নয়, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) উন্নয়ন প্রকল্পে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও আর্থিক নৈরাজ্যের চাক্ষুষ দলিল।
প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরের একক আধিপত্য, বেপরোয়া ঘুষ লেনদেন ও জালিয়াতির ফিরিস্তি এখন পাহাড়ঘেরা এই বিদ্যাপীঠের প্রতিটি কোণায় আলোচনার তুঙ্গে।
যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে চেয়ার দখল করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বহুমাত্রিক প্রমান মিললেও রহস্যজনক কারণে নীরব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
অবশেষে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসে উঠেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য দপ্তরের সামনে প্রতীকী ‘ঘৃণা মঞ্চ’ গেড়ে স্মারক অর্পণ এবং অডিও-ভিডিও প্রমাণ ছড়িয়ে উন্মোচন করেছেন এই অনিয়মের জট।
টেবিলের দামে ভুতুড়ে লাফ ও ভুয়া নথির ফাঁদ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গফুর সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতির চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, একটি সাধারণ অফিসের কাঠের টেবিল-যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮০ হাজার টাকা। নথিপত্রে তার দর হাঁকানো হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
শুধু তা-ই নয়, সরকারি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ বিধিমালার তোয়াক্কা না করে ঢাকা সফরের নামে মাসে লাখ লাখ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করারও অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে দাবি, কর্মচারীদের নামে ক্ষমতার দাপটে অগ্রিম অর্থ উত্তোলন করে নিজের পকেটে পুরেছেন তিনি, যেখানে মূল কর্মচারীর কোনো স্বাক্ষরই ছিল না।
মাস্টারপ্ল্যান খাতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, পিডি গফুরের নামে ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা ছাড়াও কর্মচারী মার্শাল চাকমা, নিশান চাকমা, সেকশন অফিসার আবদুল হক ও মনজুরুল ইসলামের নামে অন্তত আধা কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের অর্থ ‘অগ্রিম’ হিসেবে তুলে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
পরিবেশ মামলা থেকে বরখাস্ত: বহাল তবিয়তে নেপথ্যের প্রভূ
পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই পাহাড় কেটে অবকাঠামো নির্মাণ করায় রাবিপ্রবি প্রকল্প ইতোমধ্যে আইনি মামলায় জড়িয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নজরদারি এড়িয়ে ঠিকাদার এবং কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডে’র সাথে সরাসরি অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিস্তর প্রমান রয়েছে।
চারপাশের এই সীমাহীন শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে গত ৭ জানুয়ারি তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অথচ প্রশাসনিক বরখাস্তের আদেশকে তোয়াক্কা না করে ক্যাম্পাসে এখনও প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন তিনি।
আন্দোলনের মুখে প্রশাসন: অডিও রেকর্ডে ঘুষ লেনদেনের হাঁড়ি ফাটল
নিয়োগ বাণিজ্য সংক্রান্ত ২০ লাখ টাকা লেনদেনের একটি অডিও-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিকদের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে উদযাপিত হয়েছে ‘ঘৃণা কর্মসূচি’।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত ২৮ জুলাই মানববন্ধনের মাধ্যমে বিষয়টি স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হলেও উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ পাওয়া যায়নি।
ফলে এক মিনিটের নীরবতা পালন ও প্রতীকী চেয়ারে স্মারক অর্পণের মাধ্যমে তারা প্রশাসনের এই চরম নিষ্ক্রিয়তার জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
একচ্ছত্র ক্ষমতা ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এই ভয়ঙ্কর খতিয়ান, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন থমকে দেয়া ছাড়াও পুরো উচ্চশিক্ষার স্বকীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তদন্ত ত্বরান্বিত করে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে পূর্ণাঙ্গ শাস্তির মুখোমুখি করা না হলে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

