সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস ইয়ার্ড যেন বিষাক্ত মৃত্যুফাঁদ: জাহাজ কাটার আড়ালে হাজারো শ্রমিকের নীরব সমাধি!

বিলিয়ন ডলারের আড়ালে রক্তের হোলি খেলা

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ০০:৫০

সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূলে বাতাস কোনোদিন পরিচ্ছন্ন থাকে না। পুরোনো লোহার কঙ্কাল কাটার যে কানফাটা গর্জন প্রতিদিন সেখানে ভেসে আসে, তার আড়ালে আসলে চাপা পড়ে থাকে হাজারো শ্রমিকের নীরব আর্তনাদ। 

গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভাটিয়ারী এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের যে তাণ্ডব ঘটে গেল, তা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অন্ধত্ব ও কাঠামোগত অবহেলার এক রক্তাল্প ধারাক্রম।

স্ক্র্যাপ এলএনজি পরিবাহী এক বাতিল জাহাজের পেট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের তীব্র বিষক্রিয়ায় ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে মিলিয়ে অকালে ঝরে গেছে ৯টি তরটাজা প্রাণ।

আর সেই বিষাক্ত বাষ্পের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন আরও ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক।

দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষ দায় এড়ানোর চিরাচরিত খেলায় মেতেছে। ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ প্রথমে গণমাধমে দাবি করেছেন, শুক্রবার ছুটির দিনে জাহাজ থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হলে তা দেখতে গিয়ে ‘বহিরাগত’ কিছু লোক বিষক্রিয়ার শিকার হন।

অন্যদিকে এডমিন সাইফুজ্জামান বিস্ফোরণের ঘটনা অস্বীকার করে কেবল গ্যাস লিকেজকে দায়ী করেন।

তবে মূল সত্য বেরিয়ে আসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদের বক্তব্যে। বলেন, জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন পরীক্ষা করতে গিয়ে সেফটি টিমের সদস্যরা একের পর এক ঢলে পড়েন সংজ্ঞাহীন হয়ে।

প্রশ্ন উঠেছে, কাজের পরিবেশ ও ঝুঁকি যাচাই না করে শ্রমিকদের কেন সেই বিষাক্ত কুঠুরিতে নামানো হলো?

স্থানীয় শ্রমিক নেতা ফজলুর কবির মিন্টুর অভিযোগ স্পষ্ট-জাহাজে জমে থাকা মারাত্মক তরল বর্জ্য কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করার কোনো ন্যূনতম প্রযুক্তি ব্যবহার না করেই মালিকপক্ষ শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে বিএসবিআর সভাপতি মো. মহসিন চৌধুরীর স্বাক্ষরিত দাফতরিক স্মারকের মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এতে বিএসবিআরের টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং সদস্যসচিব নাজমুল ইসলামকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিএসবিআরের উপদেষ্টা নাঈম শাহ ইমরান, টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট ক্যাপ্টেন সিরাজুল মাওলা এবং এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাহাবুবুর রহমান।

তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শুক্রবার রাতে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া এ কমিটি গঠন করেন। এতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহাবুবুল হককে আহ্বায়ক এবং সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর, বিএসবিআর, পরিবেশ অধিদফতর এবং বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রতিনিধিরা। এছাড়াও শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শনিবার বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি ছিল।

কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, বিষাক্ত এই গ্যাসের কারণেই ৯ শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। তবে এর বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি-না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এসএম সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মালটি-গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।

শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।

ইতিহাস বলছে, সীতাকুণ্ডের এই রক্তক্ষরণ নতুন নয়। ঠিক এক বছর আগে, গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর এই একই ইয়ার্ডের (তৎকালীন জিয়া সুবেদার গ্রুপ) তেলের ট্যাংকার কাটতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়েছিলেন ৮ জন শ্রমিক, যাদের মধ্যে দুজনের স্থান হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট আবদুল্লাহ আল মাহমুদ তখন দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করেছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এসএন করপোরেশন ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ১২ জন দগ্ধ হন, যাদের মধ্যে ৬ জন পরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যান। কিন্তু ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য প্রকাশ করেছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

সংস্থাটির চট্টগ্রাম উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম পরিদর্শনেই প্রতিষ্ঠানটিতে ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ে। সূত্র-ইত্তেফাক

এরপর ৪ মে তাগিদ এবং ৮ জুন অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। বারবার আইন অমান্য করায় গত ১৫ জুলাই শ্রম আদালতে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করেন শ্রম পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার।

মামলার ঠিক এক মাসের মাথায় ঘটল এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। এতেই স্পষ্ট হয়, শ্রম আইনের প্রয়োগকে কতটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় এই শিপব্রেকিং খাত।

ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার তোপে ডিআইএফইর দুই পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলেছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সব অনুমোদন এই জাহাজের ছিল কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

তবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) কর্তৃক মামলা বা চূড়ান্ত নোটিশ উপেক্ষা করার অভিযোগটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।

ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সাইমন জানিয়েছেন, তাদের দাপ্তরিক রেকর্ডে এমন কোনো নোটিশ বা মামলার নথি নেই জানিয়ে, এ সংক্রান্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নথিভিত্তিক জবাব দিতে তারা প্রস্তুত।

সেফটি প্রসিডিউর ও পরিদর্শকদের ওপর হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালা অনুযায়ী, সেফটি গিয়ার বা গ্যাস ডিটেক্টর ছাড়া শ্রমিক বা সেফটি টিমকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার সময় প্রকৃত সেফটি প্রসিডিউর মানা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই উঠে আসবে।

অন্যদিকে, সরকারি পরিদর্শকদের ওপর হামলা বা তথ্য গোপন করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলা হয়, কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটে থাকলে ভিডিও বা সরকারি রিপোর্টের মতো প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা উচিত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, জাহাজ ভাঙা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। অথচ সীতাকুণ্ডে তা পরিণত হয়েছে এক অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুফাঁদে।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের’ ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, গত দুই দশকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে চট্টগ্রামে ৪০০ এর বেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ৬ হাজারের বেশি মানুষ।

অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ওয়াইপিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গত ১৩ বছরে চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে মোট ১৬১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

সবচেয়ে আতঙ্কজনক সত্যটি উন্মোচিত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে কাজ করা পুরুষ শ্রমিকদের গড় আয়ু বাংলাদেশের জাতীয় গড় আয়ুর চেয়ে প্রায় ২০ বছর কম!

অর্থাৎ এই বালিয়াড়িতে পা রাখার অর্থই হলো নিজের জীবন থেকে দুটি দশক কেটে ফেলা। ২০২০ সাল থেকে এই ধ্বংসস্তূপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক।

বিষাক্ত পেটে নীরব ক্যানসার

একেকটি বাতিল জাহাজের ওজন ৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন। আর একটি আস্ত লোহালক্কড়ের কঙ্কাল কাটতে গিয়ে বাতাসে মুক্ত হয় ১০ থেকে ১০০ টন প্রাণঘাতী বিষাক্ত পেইন্ট। ট্যাংকগুলোতে জমে থাকে হাজার ঘনমিটার বিষাক্ত তেল।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী ‘হেলিয়ন’ (২০২৪)-এর তথ্য বলছে, এসব বর্জ্যে মেশানো থাকে পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি), পারদ, সীসা ও আর্সেনিকের মতো মারণঘাতী রাসায়নিক।

খালি পায়ে ও খালি হাতে কাজ করা শ্রমিকদের শ্বাসনালীতে প্রতিদিন ঢুকছে অ্যাসবেসটসের অদৃশ্য সূক্ষ্ম তন্তু, যা তাঁদের ঠেলে দিচ্ছে ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাসবেসটোসিস ও মেসোথেলিওমার মতো নীরব ঘাতকের দিকে। সূত্র-ডি স্টার

সংস্থাটির করা এক স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষায় দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে ৯৫.৮ শতাংশ শ্রমিকের ফুসফুস সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেও সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডে প্রবেশের কিছুদিন পরই ৭৯ শতাংশ শ্রমিকের ফুসফুস স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। ৫৮.৩৩ শতাংশ শ্রমিক হারাচ্ছেন শ্বাস ছাড়ার ক্ষমতা।

২০০০ সালের ৩১ মে ‘টিটি দেনা’ নামের ইরানি সুপার অয়েল ট্যাংকার ভাঙতে গিয়ে ৫০ জন শ্রমিকের নিমিষে ছাই হয়ে যাওয়ার সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা দেশের মানুষ ভোলে নাই। কিন্তু দুই দশক পরেও পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি।

শ্রম আইন ২০০৬, জাহাজভাঙা বিধিমালা ২০১১ কিংবা ২০২৩ সালে বাংলাদেশের অনুস্বাক্ষর করা আন্তর্জাতিক ‘হংকং কনভেনশন’-সবই এখন স্রেফ লাল ফিতার ফাইলে বন্দী।

রাষ্ট্রীয় আইনে একজন শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে মাত্র ২ লাখ টাকা, আর পঙ্গুত্বের দাম আড়াই লাখ টাকা। একে নিষ্ঠুর উপহাস ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়?

তবে এ বিষয়ে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সাইমন জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও বিস্ফোরক/গ্যাস-মুক্ত (Explosive/Gas-free) সার্টিফিকেট ছাড়া জাহাজ কাটার (Cutting operation) অভিযোগটি সঠিক নয়। ইয়ার্ডটিতে পরিবেশগত নিয়মাবলী ও আন্তর্জাতিক ‘হংকং কনভেনশন (HKC)’ কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সব ডকুমেন্টস সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি জানান।

ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিকাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA)-এর মাধ্যমে কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতিটি নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

এছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে প্রতিটি পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, এই আর্থিক সহায়তা আইনগত দায় স্বীকার নয়, বরং কেবলই একটি মানবিক পদক্ষেপ।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিআইএফই নিজেই স্বীকার করে যে, এসব বিষাক্ত গ্যাসের কারিগরি ঝুঁকি পরিমাপের সক্ষমতা বা সরঞ্জাম তাদের নেই! যে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো নিজের সীমাবদ্ধতা ঢাকতে অনভিজ্ঞ শ্রমিকদের ওপর দায় চাপায়, সেখানে শ্রমিকের সুরক্ষা একটি অবাস্তব কল্পনামাত্র।

সীতাকুণ্ডের বিষাক্ত বালুতে শ্রমিকদের ঘাম নয়, প্রতিদিন মিশছে কাঁচা রক্ত।

বিলিয়ন ডলারের এই জাঁকজমকপূর্ণ শিল্পের অন্তরালে মানুষের জীবনের দাম যেখানে শূন্যের কোঠায়, সেখানে বিচারবিভাগীয় বা স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর হিসাব না নিলে এই ‘কসাইখানা’ কখনোই বন্ধ হবে না।

সীতাকুণ্ড কি তবে লাশের মিছিল দিয়েই তার শিল্প বিপ্লবের হিসাব মিলাবে?

এসব বিষয় নিয়ে কথা হলে গত ১৪ আগস্টের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট শিপ রিকাইক্লিং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে।

একই সাথে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য বা প্রতিষ্ঠানের দায় হিসেবে প্রচার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সর্বোপরি, শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সত্য উদঘাটনের অনুরোধ জানিয়েছেন ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সাইমন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি