আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সর্বোচ্চ দপ্তর-সবখানেই যেন তাঁর অলিখিত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন একটিই নাম, আরমান।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ছায়াসঙ্গী ও বিতর্কিত ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. আরমান উদ্দিনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক মহা-ত্রাস ও ছায়া শাসনের ভয়ংকর সাম্রাজ্য।
চাঁদা না পেলেই মার্কেট দখল, প্রকাশ্যে হত্যা ও গুমের হুমকি, ইটভাটা ও বালুমহাল থেকে তোলা আদায়, এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি সম্পদ লুটের রাজত্ব কায়েমের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০ লাখ টাকা চাঁদা ও প্রবাসীর মার্কেট দখল
সর্বশেষ ঘটনায় আরমান উদ্দিন ও তাঁর ভাই আরিফ উদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছেন ৩০ বছরের এক প্রবাস ফেরারী ভুক্তভোগী।
লোহাগাড়ার পশ্চিম কলাউজান এলাকার বাসিন্দা প্রবাসফেরত আমির হোসেনের অভিযোগ, ২০০৬-০৭ সালে কেনা জমিতে নির্মিত তাঁর চারতলা ‘আজিজ কমপ্লেক্স’ দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন আরমান বাহিনী।
আমির হোসেন ভিন্ন এলাকা থেকে এসে বসবাস করার অজুহাতে তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ৩ এপ্রিল গভীর রাতে আজিজ কমপ্লেক্সের নিচতলায় প্রবাসীর ভাড়াটিয়া ওবায়দুলের আলমারির দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
দোকান থেকে (১২টি তিন-পার্টের স্টিলের আলমারি, তিনটি দুই-পার্টের আলমারি, দুটি দুই দরজার আলমারি, ছয়টি চার দরজার ওয়াল শোকেস, দুটি দুই পাশের দরজার ওয়াল শোকেস, আলমারি শিটসহ) প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকার মালামাল ও নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় আসামিরা। এরপর দোকানে নতুন তালা ঝুলিয়ে দখল নেওয়া হয়।
বাদী দেশে ফিরে গত ২০ আগস্ট আলোচনায় বসলে আরিফ উদ্দিন ও আরমান মোবাইল ফোনে পুনরায় চাঁদা দাবি করে প্রকাশ্যে হুমকি দেন, “আমাদের কথামতো না চললে লাশ গুম করে ফেলা হবে।” এ সময় বাদীকে এলোপাতাড়ি মারধরও করা হয়।
স্থানীয় থানায় পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানালে রোববার (২৩ আগস্ট) চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা ঠুকে দেন ভুক্তভোগী প্রবাসী।
মামলার আরজিতে আরমান উদ্দিনের পাশাপাশি তাঁর ভাই আরিফ উদ্দিন (৩৭), লোহাগাড়ার শওকত আলী (৪২), আদিল (৩২), আনোয়ার (২৮) ও জয়নাল আবেদীন (৩৩)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আদনান কবির জিলান।
স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার সঙ্গে বালু সিন্ডিকেট ও বিতর্কিত ডিও লেটার
সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পটপরিবর্তনের পর আরমানের ভয়াল রূপ আরও জাঁকিয়ে বসে। স্থানীয় ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আটকে রেখে নির্যাতন এবং বিপুল অংকের টাকা আদায়ের মাধ্যমে তাঁর এই অপরাধ সাম্রাজ্যের সূচনা হয়।
পরবর্তীতে ক্ষমতার দাপট বজায় রাখতে তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভীর আস্থাভাজন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সখ্য গড়ে তোলেন।
টংকাবতী খাল খননের নামে অবৈধ বালু উত্তোলনের জন্য এই শাহাদাতকে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর মাধ্যমে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বরাবর ডিও লেটার পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন আরমান।
সংসদ সদস্য ইজারা বন্ধ রাখার দাবি করলেও বাস্তবে আরমান-শাহাদাত সিন্ডিকেট খালের বিভিন্ন স্থান থেকে কোটি কোটি টাকার বালু তুলে এলাকা তছনছ করে দিচ্ছে।
লিক হওয়া অডিও: ‘লোহাগাড়ায় আরমানের কথাই শেষ কথা’
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিক হওয়া একটি অডিওতে লোহাগাড়ার অবৈধ বালু ব্যবসা ও ভয়ংকর আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে আসে।
অডিওতে যুবদলকর্মী ও অবৈধ বালু ব্যবসায়ী তারেকুল হককে স্পষ্ট ভাষায় বলতে শোনা যায়, “লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে। লোহাগাড়ার আরমান।” সূত্র-এপত্রিকা
অডিওর অপর প্রান্তে থাকা আরমান উদ্দিন নীরব সায় দিয়ে পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে প্রমাণিত হয়।
জামায়াতের ভেতর চরম অস্বস্তি ও গা ঢাকা
সাধারণত জামায়াত নেতাদের আনুষ্ঠানিক পিএ রাখার রীতি না থাকলেও সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী আরমানকে প্রতিটি দলীয় নীতি-নির্ধারণী বৈঠকেও পাশে রাখেন।
ফলে খোদ জামায়াতের ভেতরের সিনিয়র নেতারাও তীব্র বিব্রত ও উদ্বিগ্ন। ইটভাটার মাটির ব্যবসা নিয়ে সন্ত্রাসী আকাশ চৌধুরীর সঙ্গে অডিও কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য অনিয়মের জেরে ইতিমধ্যেই জামায়াত দলীয়ভাবে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।
এসব ঘটনার জেরে গত ১৩ জুন শাহজাহান চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মহানগর আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর থেকে আরমানের সঙ্গে যোগাযোগের অনেকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত কার্যালয়েও তাঁর দেখা মেলেনি।
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, আদালতের নথিপত্র হাতে পাওয়ামাত্রই কঠোর তদন্ত শুরু হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই ছায়া প্রশাসনের ভয়াল থাবা ও ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেবে কি না-এখন সেটাই সাতকানিয়া-লোহাগাড়াবাসীর মূল প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

