ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ বণ্টন ঘিরে পটিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ!

দুস্থদের অর্থ ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বণ্টনের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬ ১৭:২৩

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতের অভিযোগ ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দকৃত ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকার অনুদান বিতরণের একটি তালিকা সামনে আসার পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

স্থানীয় সূত্র, সুবিধাভোগীদের নামের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুদানপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ একই ভৌগোলিক ও সামাজিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

একই গ্রামের আধিপত্য-সুবিধাভোগী তালিকায় “কৈয়গ্রাম” ঘিরে ঘনত্ব:
তালিকা অনুযায়ী পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের কৈয়গ্রাম এলাকার একাধিক বাসিন্দা এই অনুদানের সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

এদের মধ্যে বুলু আকতার, হাসনা খাতুন, হোসনেরা বেগম, মুছাৎ হোসনেরা বেগম, রাজিয়া আকতার, হানিফাতুল মোজাহেবা, আজিজুল হক ও মরিয়ম বেগমের নাম রয়েছে।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এই তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা একে অপরের পরিচিত এবং একই সামাজিক ও পারিবারিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—ঐচ্ছিক তহবিল বণ্টনে কি প্রকৃত অর্থে দুস্থ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে?

ঐচ্ছিক তহবিল বণ্টনের তালিকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তি:
শুধু চেনা-জানা কিংবা স্বজনপ্রীতিই নয়, আরও বিতর্ক তৈরি করেছে সংসদ সদস্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ আসায়।

চট্টগ্রামের চাকতাই এলাকায় অবস্থিত ‘আলম ট্রেডিং’-এর কর্মচারী হিসেবে পরিচিত জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, মোহাম্মদ শাকেল, মো. ওমর ফারুক এবং পিকলু চৌধুরীর নামও অনুদান তালিকায় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সরকারি তহবিল সাধারণত দরিদ্র ও সংকটাপন্ন নাগরিকদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের একই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি প্রশাসনিক মানদণ্ড ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ব্যক্তিগত গৃহস্থালির কেয়ারটেকার ও টি-বয়ও রয়েছে তালিকায়:
অনুদান তালিকায় আরও বিস্ময়কর বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে সংসদ সদস্যের বাড়ির কর্মচারীদের নাম।

অভিযোগ অনুযায়ী, কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর এবং টি-বয় তানজিমুল হক আহাদও এই তহবিলের সুবিধাভোগী হয়েছেন। সূত্র- ইত্তেফাক

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের অন্তর্ভুক্তি হলে তা “দুর্গত বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ” নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার মন্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

কোথায় যাচাই প্রক্রিয়া?
ঐচ্ছিক তহবিল বিতরণের ক্ষেত্রে সাধারণত উপজেলা প্রশাসনের যাচাই ও সুপারিশ প্রক্রিয়া থাকার কথা। তবে এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—সুবিধাভোগী নির্ধারণে কি প্রকৃত সামাজিক যাচাই হয়েছে?

একই ভৌগোলিক ও পারিবারিক নেটওয়ার্ক কীভাবে এত বেশি প্রতিনিধিত্ব পেল? ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত কর্মচারীরা কোন ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত হলেন?

এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমানেরও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। বক্তব্য পেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: তদন্তের দাবি জোরালো
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি ইদ্রিস মিয়া বলেন, “আমরা এই বিষয়টির একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। সরকারি অর্থের এমন ব্যবহারের বিষয়টি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এ ঘটনার পর প্রধান প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে—ঐচ্ছিক তহবিল কি সত্যিই “দুস্থদের জন্য”, নাকি “ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের জন্য”? প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব কি সুবিধাভোগী তালিকা নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

চট্টগ্রাম-১২ আসনের ঐচ্ছিক তহবিল বিতরণ ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধুই স্থানীয় আলোচনা নয়—বরং এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তদন্ত ছাড়া এই বিতর্কের অবসান ঘটবে কি না—তা এখন প্রশাসনের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি