চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানাধীন এলাকায় সংঘটিত দুটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে উভয় ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিখোঁজ শিশু জায়হান হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন:
চট্টগ্রামের পটিয়ায় নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর পাঁচ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ জায়হানের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
পারিবারিক জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।
পুলিশ জানায়, গত ১৬ জুন পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহান তাঁর ছেলে মোহাম্মদ জায়হান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর পটিয়া থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধারে অনুসন্ধান শুরু করে। একই সঙ্গে সারা দেশে বেতার বার্তার মাধ্যমে শিশুটির সন্ধান চাওয়া হয়।
নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পটিয়া থানা পুলিশের সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ আভিযানিক দল গঠন করা হয়।
দলগুলো শিশুটির আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালায়।
তদন্ত চলাকালে শিশুটির পরিবারের বসতঘর থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির রেখে যাওয়া মুক্তিপণ ও হুমকিমূলক একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়।
চিরকুটটির লেখা, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, বিভিন্ন আলামত এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ।
একপর্যায়ে তদন্তে সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯) নামের এক তরুণীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। তিনি সাইফুদ্দিনের মেয়ে এবং পটিয়া শেভরন হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত।
তিনি নিহত শিশুর পরিবারের প্রতিবেশী। তদন্তে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখার সঙ্গে তাঁর হাতের লেখার সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, পারিবারিক জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরে অপহরণের ঘটনা হিসেবে দেখাতে মুক্তিপণের চিরকুট রেখে যাওয়া হয়।
আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৮ জুন রাত আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে তাঁদের বসতঘরের পেছনের নর্দমার ময়লার স্তূপে লুকিয়ে রাখা বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পঙ্কজ শীল হত্যা মামলায় দুই আসামি গ্রেপ্তার
এদিকে গত ৯ জুন পটিয়া থানার চক্রশালা এলাকায় সংঘটিত পঙ্কজ শীল হত্যা ও তিলক চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টা মামলার রহস্যও উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, চক্রশালা এলাকার একটি সড়কে সন্দেহজনকভাবে অবস্থানরত এক নারী ও এক পুরুষকে জিজ্ঞাসাবাদকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পঙ্কজ শীল ও তিলক চক্রবর্তীর ওপর হামলা চালান।
গুরুতর আহত অবস্থায় পঙ্কজ শীলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত তিলক চক্রবর্তী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার পর পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আসামিদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন টেকনাফ থানা পুলিশের সহযোগিতায় টেকনাফ এলাকা থেকে মো. আব্দুল রহমান (২৩) এবং ১৮ জুন চন্দনাইশ এলাকা থেকে ফাতেমা বেগম নেহা (১৯)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার সময় তাঁদের পরিহিত পোশাক জব্দ করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে দুটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

