অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভিপিএন কিংবা মিরর সাইট—প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার প্রায় সব কৌশলকে এবার আইনের আওতায় আনল সরকার।
একই সঙ্গে বাতিল হলো ব্রিটিশ আমলের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, 1867’।
জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’। নতুন এই আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড, ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, সম্পদ জব্দ, ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্লক এবং অর্থপাচারের অভিযোগে পৃথক আইনে বিচারের বিধান রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
এর আগে গত ২৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে এটি পরীক্ষা করে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সুপারিশের পর মঙ্গলবার বিলটি পাস হয়।
কেন নতুন আইন :
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘The Public Gambling Act, 1867’ বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার ধরন মোকাবিলার জন্য আর কার্যকর নয়।
তিনি জানান, সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জুয়া প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
এছাড়া ২০১৮ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও আইনটি যুগোপযোগী করে শাস্তি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
সরকারের মতে, বর্তমানে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, ভিপিএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া, প্রতারণা ও অর্থপাচার দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
যেসব অপরাধকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে
নতুন আইনে ২৪টি বিষয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে—
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া পরিচালনা
অনলাইন বেটিং
জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার
জুয়ার সামগ্রী প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিক্রি বা বিতরণ
বাজিকর (বুকমেকার) হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা
ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং
জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও রেফারেল ক্যাম্পেইন
ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা
ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ও বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা
জুয়ার অর্থ লেনদেন, অর্থপাচার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার।
কোন অপরাধে কত শাস্তি
নতুন আইন অনুযায়ী—
সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা।
অনলাইন বেটিং পরিচালনায় সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা।
বাজিকর (বুকমেকার) হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনায়ও সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা।
ম্যাচ ফিক্সিংয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা।
স্পট ফিক্সিংয়ে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।
জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনে যুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধেও সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ভিপিএন, ক্রিপ্টো ও ভুয়া সিম ব্যবহারে কঠোর শাস্তি:
আইনে ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্লাউড অবকাঠামো, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনাকে পৃথক অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আর সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এসব অপরাধ করলে শাস্তি বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।
অর্থপাচারের মামলাও হবে:
জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীন সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate Offence) হিসেবে গণ্য হবে।
কোম্পানি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও দায় এড়াতে পারবে না
কোনো কোম্পানি, করপোরেট সংস্থা, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার, পেমেন্ট গেটওয়ে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, অংশীদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে, যদি না তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তাঁর অজ্ঞাতসারে ঘটেছে এবং তা প্রতিরোধে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটিকেও পৃথকভাবে অভিযুক্ত করা যাবে। আদালত প্রয়োজন হলে তাদের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ করতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরায় ঘটলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়া যাবে।
সম্পদ জব্দ, ওয়েবসাইট ব্লক :
নতুন আইনে আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম ও অন্যান্য সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
সরকার বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে জুয়া বা বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ, চ্যানেল এবং ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে।
জামিন অযোগ্য, বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে
আইনে বলা হয়েছে, এই আইনের আওতায় সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য হবে।
অনলাইন জুয়া ও সাইবারভিত্তিক অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্য অপরাধগুলোর বিচার হবে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতে।
থাকছে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট
আইন বাস্তবায়নে সরকার একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ প্রণয়ন করবে। পাশাপাশি এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ কার্যকর হলে অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা ও অর্থপাচার প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি হবে এবং দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

