বহুতল আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ১০ তলার অবকাঠামো। অনুমোদিত নকশায় ১৯টি মূল স্তম্ভ বা পিলার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দাঁড় করানো হয়েছে মাত্র ১৭টি।
শুধু তা-ই নয়, হাইকোর্টের স্পষ্ট স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, অগ্নিনিরাপত্তা ও পার্কিং সুবিধা ছাড়াই চালু করার চেষ্টা হচ্ছিল এক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানাধীন মেহেদীবাগ রোডের ‘এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এর বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক জালিয়াতি ও অনিয়মের চিত্র দেখে খোদ আঁতকে উঠেছেন তদারকি সংস্থার কর্মকর্তারা।
ভয়াবহ এই নকশা জালিয়াতি, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ও কাঠামোগত ঝুঁকির তথ্য সামনে আসার পর উদ্বোধনের আগেই হাসপাতালটির সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
একই সাথে পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় এবং অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
নকশায় যা ছিল বাস্তবে যা পাওয়া গেছে
─────────────────────────────────────────────────────────────
• অনুমোদন: আবাসিক ফ্ল্যাট ভবন • ব্যবহৃত হচ্ছে: ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল
• নির্ধারিত পিলার: ১৯টি • নির্মিত পিলার: ১৭টি (২টি গায়েব)
• লিফটের সংখ্যা: নির্দিষ্ট • তৈরি করা হয়েছে: অতিরিক্ত ১টি লিফট
• আইনি অবস্থা: হাইকোর্টের স্টে অর্ডার • অমান্য করে দ্রুত নির্মাণের কাজ সম্পন্ন
• পরিবেশ ছাড়পত্র: বাধ্যতামূলক • কোনো অনুমতি ছাড়াই বর্জ্য অপসারণ
অনুসন্ধানে জানা যায়, এরিস্টোকেয়ার ভবনের নির্মাণকাজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিরাপত্তা চেয়ে ২০২৫ সালের ৪ জুন উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন শহীদ উল্লাহ নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা।
শুনানি শেষে একই বছরের ২৪ জুন হাইকোর্ট ভবনটির নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ দেন। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি তোয়াক্কা না করেই রাতারাতি শেষ করা হয় হাসপাতালের সাজসজ্জা ও ভবন নির্মাণের কাজ।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বেলা ১২টায় সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে সিডিএর এক উচ্চপর্যায়ের দল মেহেদীবাগ এলাকার এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালে অভিযান চালায়। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তদন্তে দেখা যায়, ফ্ল্যাট নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে তৈরি ভবনে হাসপাতাল পরিচালনার তোড়জোড় চলছে। ১০ তলা ভবনের মূল নকশা পরিবর্তন করে দুটি পিলার গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একটি অতিরিক্ত লিফট বসানো হয়েছে।
সিডিএর চিফ ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, আমরা পরিদর্শনে গিয়ে একের পর এক গুরুতর অসঙ্গতি পেয়েছি। নকশা ব্যত্যয় করে কীভাবে এই ভবন দাঁড় করানো হলো, তা নিয়ে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসব। আপাতত পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আবাসিক ফ্ল্যাটের জায়গায় হাসপাতাল করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকৌশলীরা ভবনে বেশ কিছু বড় ধরনের মেকানিক্যাল ও স্ট্রাকচারাল ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন।
ভবনটি আদৌ রোগী ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ কি না, তা বিশদভাবে যাচাই করা হবে। পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প-সহনশীলতা এবং প্রয়োজনীয় সব সরকারি সনদ না থাকলে কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসা চালুর অনুমতি দেওয়া হবে না।
পরিবেশ আইনের চরম লঙ্ঘন ও জরিমানা
কাঠামোগত ঝুঁকির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী যেকোনো হাসপাতাল চালুর আগে অবস্থানগত ছাড়পত্র ও তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক।
গত ২৯ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি ভিজিল্যান্স টিম হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই পরিবেশ দূষণ করে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
পরিদর্শনের পর সোমবার (৩ আগস্ট) পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে আয়োজিত শুনানিতে হাজির হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অপরাধ ও অনিয়ম স্বীকার করে নেয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়া সংক্রামক বর্জ্য ও মেডিকেল লিকুইড ওয়েস্ট ফেলার ব্যবস্থা করা আইনত অপরাধ।
শুনানিতে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সাথে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তরল বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর এবং জীবন-মৃত্যুর সাথে জড়িত একটি সেবা খাত কীভাবে সরকারি চার-পাঁচটি দপ্তরের অনুমোদন ও নকশা তোয়াক্কা না করে একটি সম্পূর্ণ ১০ তলা ভবন দাঁড়িয়ে গেল-তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
বিশেষ করে, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় কার ছত্রছায়ায় এবং কোন অদৃশ্য ক্ষমতার বলে এই বেআইনি নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলো, তার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এই সাময়িক পদক্ষেপ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য হলেও, কেবল জরিমানা বা মৌখিক নির্দেশনায় থেমে থাকলে চলবে না।
ভবনটির কাঠামোগত স্থায়িত্ব পরীক্ষা (ডিটিপি/ইটিপি টেস্ট) নিশ্চিত করা এবং এই জালিয়াতির সাথে যুক্ত প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, ভবিষ্যতে এটি বড় কোনো ট্র্যাজেডির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

