দিনমজুর-কৃষকের সন্তানদের জয়জয়কার-সেরা বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়!

লোহাগাড়ার দুর্গম পাহাড়ি গাঁয়ে সাফল্যের ফিনিক্স

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:১৮

রায়হান সিকদার,লোহাগাড়া প্রতিনিধি : পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজে ঘেরা নিভৃত এক জনপদ-চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা গ্রাম। লোহাগাড়ার একদম শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই অখ্যাত অঝোঁপড়া গাঁয়ে যে দিনমজুর আর কৃষক পরিবারের সন্তানদের বাস, সেখানে পড়াশোনার মেজাজ তৈরি করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

অথচ সেই দুর্গম জনপদেই ঘটে গেল এক নীরব বিপ্লব! সব প্রতিকূলতা জয় করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ৮৭.৫০ শতাংশ পাসের হার নিয়ে লোহাগাড়া উপজেলার শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে বীর বিক্রম জয়নুল আবেদীন উচ্চ বিদ্যালয়

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শত বাধা সত্ত্বেও অর্জিত এই সাফল্য উপজেলার অন্যান্য সুপরিচিত স্কুলগুলোকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে।

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যাপীঠটি থেকে মোট ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, যার মধ্যে নিয়মিত ৩৫ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকেই পাসের হাসি হেসেছে (১০০% পাসের হার)।

বিদ্যালয়টির এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্যে ছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিচালনা পর্ষদের নিখুঁত পরিকল্পনা।

প্রধান শিক্ষক শওকত ইসলাম জানান, এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেদের জন্য ১০ম শ্রেণীতে বাধ্যতামূলক হোস্টেল সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি গণিত ও ইংরেজির মতো জটিল বিষয়ে ছিল বিশেষ কোচিং এবং কঠোর মাসিক মূল্যায়ন।

শিক্ষকদের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, আমাদের এলাকার অনেক পরিবারে বই-পুস্তকের কোনো গন্ধ ছিল না। কিন্তু আমরা হার মানিনি। মেয়েদের বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত ‘হোম ভিজিট’ করা হয়েছে, আর অভিভাবকদের সচেতন করতে করা হয়েছে উঠান বৈঠক।

এমনকি কঠোর নীতি মেনে নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস ছাড়া কাউকে মূল পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি। এই কঠোরতা ও স্নেহের সঠিক মিশ্রণই আমাদের কাঙ্ক্ষিত সফলতা এনে দিয়েছে।

বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চুনতি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বিগত সময়ে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও শিক্ষকরা এবার প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তদারকি করেছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিনমজুর ও শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যকার দৃঢ় প্রত্যয়ই আজ তাঁদের এ দূরবর্তী সীমান্ত ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই পুরো পানত্রিশা গ্রামজুড়ে বইছে আনন্দের উৎসব। এসএসসি পরীক্ষার্থী মিতিলা জান্নাত ও তাসকিয়া জায়তুন আবেগপ্লুত হয়ে জানায়, শিক্ষকরা কেবল পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনাই করাননি, সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম ও স্পেশাল গাইডলাইনের ফলেই আজ এই অলৌকিক অর্জন সম্ভব হয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবক আবদুল মালেক ও এলাকা বাসিন্দা রেজাউল বাহার রাজা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, পানত্রিশার মতো অনগ্রসর এলাকায় এত মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে।

শিক্ষাসংগ্রামের এই ধারাবাহিকতা থাকলে এটি শুধু উপজেলা নয়, দ্রুতই চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ অনগ্রসরতার উদাহরণ ছিল, আজ তা পুরো লোহাগাড়ার শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষকবৃন্দের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সার্বক্ষণিক তদারকি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই বিদ্যাপীঠের আগামী লক্ষ্য-জেলা পর্যায়ে সেরার মুকুট ছিনিয়ে আনা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি