পার্কভিউ হাসপাতালে স্বজনদের কান্না-ওরা আমার বোনকে শেষ করে ফেলছে!

প্রসূতির পেট কাটলো দু’বার, চিকিৎসক বলছে লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৪০

ভুল চিকিৎসা নাকি গোপন চেষ্টার খেসারত? ‘কসাইখানা’ আখ্যা দিয়ে নেটিজেনদের তদন্তের দাবি

সুস্থ সন্তানের মুখ দেখার আনন্দ মুহূর্তে ফিকে হয়ে রূপ নিয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে। স্বজনদের অভিযোগ, সাধারণ একটি সিজারিয়ান অপারেশনের পর চিকিৎসকদের গাফিলতি ঢাকতে প্রসূতিকে না জানিয়ে গোপনে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

উপরন্তু, প্রকৃত অবস্থা আড়াল করতে প্রসূতিকে ‘সন্তানকে দুধ খাওয়ানো’র অজুহাতে সরিয়ে নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের স্বনামধন্য বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘পার্কভিউ হাসপাতাল’ এ ঘটেছে এমনই এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা।

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট)। স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রসূতির নাম সাজু। স্বামীর নাম মো. ইমরান। তার তীব্র যন্ত্রণা কমিয়ে সুস্থভাবে সন্তান প্রসবের আশায় স্ত্রীরোগ, প্রসূতি বিদ্যা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহানারা বেগম শিখার তত্বাবধানে তাকে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে চিকিৎসকরা প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার (সিজার) সম্পন্ন করেন এবং একটি নবজাতক জন্ম নেয়। তবে বিপত্তি ঘটে এর কিছুক্ষণ পর।

অভিযোগ ওঠে, প্রথম অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের মারাত্মক কোনো ভুল বা অদক্ষতার কারণে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ৭/৮ ব্যাগেরও বেশি রক্ত দেওয়া হলেও রক্তের ক্ষরণ বা শারীরিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে অভ্যন্তরীণ একটি জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক দল গঠন করে।

স্বজনদের দাবি, চট্টগ্রামের বিশিষ্ট চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হাসপাতালে এসে পৌঁছান এবং রোগীকে দেখে যান। পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে প্রসূতিকে পুনরায় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়ে যান হাসপাতালের আগের ওটি টিম।

পরবর্তীতে পুনরায় স্বজনদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে প্রসূতির পেটে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা হয়।

সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রসূতিকে রাখা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সম্পূর্ণ গোপন রাখার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ প্রসূতির মা মরতুজা বেগমের।

তিনি আক্ষেপ করে জানান, ৪টার পর থেকে মেয়ের আসল অবস্থা জানতে চাইলে হাসপাতাল থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর জন্য মাকে ভেতরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নবজাতককে বাইরের কৌটার দুধ (তোলা খাবার) খাওয়ানো হচ্ছিল।

বারবার মেয়েকে দেখতে চাওয়ার আকুতি জানানো সত্ত্বেও স্বজনদের প্রসূতির সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে জানা যায়, প্রসূতির অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, প্রসূতির দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন রহস্যজনক আচরণের বিষয়টি জানাজানি হলে মঙ্গলবার গভীর রাতে হাসপাতালের ভেতরেই স্বজনদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।

চিকিৎসায় গাফিলতি ও তথ্য গোপনের অভিযোগে স্বজনদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার রাত ১১টা ২৮ মিনিটে ‘Psp Vision’ নামক একটি ফেসবুক পেজে প্রসূতির স্বজনদের সেই হট্টগোলের ভিডিও পোস্ট করা হলে মুহূর্তেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক জনরোষের জন্ম দেয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য ব্যবহারকারী স্বাস্থ্যসেবার নামে এমন কর্মকাণ্ডের কঠোর তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।

‘Md Lokman RL’ নামের এক নেটিজেন মন্তব্য করেন, অপারেশন চলাকালে পেটের ভেতরে চিকিৎসকদের সরঞ্জাম ফেলে আসাতেই হয়তো দুইবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।

অন্যদিকে ‘Runabegum Runa’ নামের একজন কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করে লেখেন, প্রথম সিজারের পর পেটের ভেতর রক্তক্ষরণ বা জটিলতা দেখা দেওয়ায় রোগীর জীবন বাঁচাতেই দ্বিতীয়বার পেট কাটতে হতে পারে।

তবে হাসপাতালটির সাম্প্রতিক নানা অনিয়ম ও অতীতের তিতো অভিজ্ঞতা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অনেকে।

‘Salina Jahan Bobbi’ নামের এক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে লিখেছেন, পার্কভিউয়ের ওপর ঘৃণা চলে আসছে। ৫ আগস্ট আমার বাবা হেঁটে এ হাসপাতালে গিয়েছিলেন, আর তাকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সে করে-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছি।

এছাড়া ‘Nirob Mohin Uddin’, ‘Lutful Haider’, ‘Anjuman Chowdhury’, ‘Mohammad Alamgir’ এবং ‘নিশ্চুপ নিস্তব্ধতা’ আইডি থেকে হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনাকে তীব্র সমালোচনা করে ‘কসাইখানা’ ও স্বাস্থ্যের নামে ‘বাটপারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

আজ বুধবার (বিকেল সাড়ে ৪টা) এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রসূতি সাজুর ভাই মো. ওমর ফারুক জানান, হাসপাতাল থেকে কোন সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ বলছে রোগী ভাল আছে। আবার কিছুক্ষণ পরে বলছে সংকটাপন্ন। রক্ত প্রয়োজন। প্রেসার কমে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় স্বজনরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে রোগীর ভাই দাবি করেন, কেন এরকম হল?

সবশেষ পৌণে ৫টার সময় আইসিইউ চিকিৎসক ডা. আশিষ স্বজনদের জানান, রোগীর অবস্থা ভাল না। লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে। এটা শুনেই স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার ভাই ওমর ফারুক বলেন, ওরা আমার বোনকে শেষ করে দিয়েছে।

তিনি ঘটনার সুষ্ট তদন্ত করে রোগীর সত্যিকার অবস্থা পরিস্কার করা এবং তার যথাযত চিকিৎসা নিশ্চিতের মাধ্যমে বোনকে জীবিত ফেরত চান।

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, একই হাসপাতালে গতকাল তাদের মতোই আরও একটি রোগীর একই অবস্থা হয়েছে। তার অবস্থাও সংকটাপন্ন। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন করেন, রোগীর যদি কিছু হয়ে যায় দায়ভার কে নিবে?

এ বিষয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্যতা জানতে ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিতে একাধিক গণমাধ্যমকর্মী বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও পার্কভিউ কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন নিশ্চুপ ভূমিকা ঘটনার রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। একজন প্রসূতির চিকিৎসায় ভুল কিংবা অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা তৈরি হলে রোগীর স্বজনদের স্পষ্টভাবে অবহিত করা চিকিৎসা শিষ্টাচার ও আইনের মৌলিক নীতি।

তবে পার্কভিউ হাসপাতালে তথ্য গোপন করে ‘বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো’র মতো বিভ্রান্তিকর অজুহাত দিয়ে রোগীকে আইসিইউতে পাঠানো এবং এক তরফা দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার চালানোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরু গম্ভীর।

ভুল অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম পেটে ফেলে আসা নাকি মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ-কোনটির কারণে প্রসূতির জীবন এভাবে ঝুঁকিতে ফেলা হলো, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

স্বাস্থ্য বিভাগ কি এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে, নাকি রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে-এখন সেটিই দেখার বিষয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি