জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, বাতাসে এখনও মৃত্যুর গন্ধ!

উপকূলজুড়ে কান্নার রোল,মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:৫১

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলে আবারও মৃত্যুর ছায়া। ভাটিয়ারির একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাস সিলিন্ডারের বিষক্রিয়ায় নিভে গেছে আরও এক শ্রমিকের প্রাণ। এ নিয়ে করুণ এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ জনে।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অন্য আহতদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি কারখানায় ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।

নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন-সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮) এবং হাবিবুর রহমান। তাঁরা সবাই স্থানীয় ভাটিয়ারি এলাকারই বাসিন্দা।

দুর্ঘটনায় আহত আরও অন্তত তিনজন শ্রমিক বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে জীনব-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন।

সাগরের বাতাস ভারী করল বিষাক্ত গ্যাস

ঘটনার ভয়াবহতা কতটা নির্মম ছিল, তা স্পষ্ট হয় স্থানীয় জেলেদের আতঙ্কের বর্ণনায়। কারখানাটির ভেতর থেকে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া ঝাঁঝালো গ্যাসের গন্ধে মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত হয়ে ওঠে আশপাশের বাতাস।

সাগরে ইলিশ ধরে ফেরা জেলেরা বিষাক্ত গ্যাসের গন্ধে কারখানার পাশের খালে নৌকা ভেড়াতে ব্যর্থ হন। জীবন বাঁচাতে ঘাটে ভিড়তে না পেরে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নোঙ্গর করতে হয় তাঁদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে আকুল কান্নার চিৎকার শুনি। তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে দেখি অসুস্থ কয়েকজনকে ধস্তাধস্তি করে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।

পরে যখন খবর ছড়ায়-জাহাজের অন্ধ কুঠুরিতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আরও কয়েকজন নিথর হয়ে পড়ে আছেন, তখন আর কাউকে ধরে রাখা যায়নি।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা কারখানায় ঢুকে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

এতে কিছু সময়ের জন্য এলাকায় চরম উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

অসতর্কতা নাকি সুরক্ষার চরম ঘাটতি?

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন মুঠোফোনে জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন।

তবে কারখানার নিজস্ব সূত্রে তিনি জেনেছেন, জাহাজে থাকা একটি বিষাক্ত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে অসতর্কতাবশত কর্মীরা আক্রান্ত হন। ঘটনার বিস্তারিত খতিয়ে দেখতে তিনি কারখানায় যাচ্ছেন বলে জানান।

এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম জানান, কারখানাটি থেকে মোট 8 জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল।

কর্তব্যরত চিকিৎসক ৬ জনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্য রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ভাটিয়ারির এই মৃত্যুপুরী আবারও স্পষ্ট আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল-দেশের সম্ভাবনাময় জাহাজভাঙা শিল্পের ভারী লোহালক্কড় আর বিষাক্ত বাষ্পের নিচে শ্রমিকের জীবনের মূল্য কতটা সস্তা ও ভঙ্গুর।

জীবনের তাগিদে জাহাজের বিষাক্ত পেটে নেমে যাওয়া এই মানুষগুলোর শেষ নিঃশ্বাস যেন সীতাকুণ্ডের উপকূলে একটাই প্রশ্ন রেখে গেল-সুরক্ষাহীন এই মৃত্যুমিছিল থামবে কবে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি