বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত শীর্ষদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক, উত্থাপিত ৯ দফা

প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৪১

এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক-ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃশ্যপট উন্মোচিত হলো চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রবিবার (৯ আগস্ট) বিকেল ৪টায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে এই বহুল আলোচিত মতবিনিময় সভা শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ৭০ জন বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন উপস্থিত ছিলেন, যেখানে ধর্মীয় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এর আগে সফরসূচি অনুযায়ী বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারযোগে ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিকেল সোয়া ৪টার দিকে সড়কপথে বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

হেলিপ্যাড থেকে মাদ্রাসা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে অবস্থান নেন।

মাদ্রাসায় পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে এক একান্ত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী হেফাজত আমিরের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর শারীরিক ও স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।

এই একান্ত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

একান্ত বৈঠকের পর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত মূল মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে মঞ্চে ও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল, উত্তর চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

হেফাজতে ইসলামের ৯ দফা দাবি

মতবিনিময় সভায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ৯টি মৌলিক ও নীতিনির্ধারণী দাবি তুলে ধরা হয়।

হেফাজতের উত্থাপিত ৯ দফা দাবিগুলো হলো:

মহান আল্লাহ, রাসূল (সা.), পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন।

কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত কথিত গণহত্যা, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।

দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা এবং ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে দাওরায়ে হাদিসকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলেমদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা।

তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা, মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।

হেফাজতের উত্থাপিত এসব দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আলেমদের পেশ করা বিষয়গুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।

তিনি উল্লেখ করেন, হেফাজতের অনেক দাবিই সরকারেরও ভাবনার বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।

দিনভর টানটান রাজনৈতিক কৌতূহল ও ধর্মীয় উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ধর্মীয় আলেম সমাজ ও সরকারের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি