চট্টগ্রাম নগরীর নতুনব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) এলাকা রাত বাড়লেই যেন এক আশঙ্কাজনক ফাঁদে পরিণত হয়। তেমনি একটি রাত ছিল গত ৭ আগস্ট। সময় তখন সাড়ে ১১টা।
মইজ্জ্যারটেক থেকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগে নতুন ব্রিজের দিকে যাচ্ছিলেন ২৫ বছর বয়সী রিদোয়ান ও তার আত্মীয় আব্দুর রাজ্জাক।
ব্রিজের ঠিক শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই থমকে যায় তাদের পথ। অন্ধকার চিরে ধারালো ছোড়া হাতে সামনে এসে দাঁড়ায় চারজনের একটি দল-আরমান (২৯), আরফান ওরফে ইরফান (২৪), করিম ওরফে পঞ্চ (২১) এবং তাদের এক অজ্ঞাতপরিচয় সহযোগী।
মুহূর্তের মধ্যে অটোরিকশার চারপাশ ঘেরাও করে ফেলে দুর্বৃত্তরা। বাধা দিতেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি মারধর।
আরফান তার হাতে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে সোজা আঘাত করে বসে রিদোয়ানের ছোট ভাইয়ের বাম উরু ও হাতে। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ।
এরপর ছিনতাইকারীরা কেড়ে নেয় দুটি মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, ব্যাংক কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, হাতঘড়ি, পাওয়ার ব্যাংক ও সাথে থাকা জামাকাপড়। রক্তাক্ত রিফাতুলকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, ঘটনার আসল চমক অপেক্ষা করছিল পরদিন সকালে।
শুধু নগদ টাকা আর মোবাইল নিয়ে ক্ষান্ত হয়নি এই চক্রটি। ৮ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে রিদোয়ানের ছিনতাই হওয়া ভিসা কার্ড ও এনআইডি ব্যবহার করে একের পর এক বিকাশ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে ট্র্যান্সফার করে নেওয়া হয় ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা!
পাশাপাশি রিদোয়ান ও তার ছোট ভাইয়ের বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকেও আরও ১৫ হাজার টাকা ক্যাশ-আউট করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, শারীরিক আক্রমণ ছাড়াও পরিকল্পিত ডিজিটাল ডাকাতি।
ঘটনার দুই দিন পর, ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১২টা। বাকলিয়া থানাধীন নতুন ব্রিজ এলাকায় স্থানীয় জনতা ও পুলিশ মিলে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে খবর পেয়ে ছুটে যান রিদোয়ান।
সেখানে পৌঁছাতেই রিদোয়ান মুখোমুখি হন সেই রাতের তিন অপরাধী-আরমান, আরফান ও করিমের। পুলিশি জেরার মুখে মুখ খুলতে বাধ্য হয় তারা। বেরিয়ে আসে ঘটনার পেছনের আরও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
ছিনতাই হওয়া মোবাইল দুটি তারা ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছিল কোতোয়ালী থানার পুরাতন রেলস্টেশন এলাকার ১৯ বছর বয়সী রাকিবের কাছে। বাকলিয়া থানা পুলিশ কালবিলম্ব না করে অভিযান চালিয়ে রাকিবকে আটক করে এবং খোয়া যাওয়া মোবাইল দুটি উদ্ধার করে।
ব্যাংক ও বিকাশ থেকে কীভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা সরিয়ে নেওয়া হলো-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুলিশ চাপ বাড়ায় আরমানের ওপর।
আরমানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সদরঘাট থানার মাদারবাড়ী রেলগেট এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে গোলাম হোসেন (৩৮) নামে আরেক সঙ্গীকে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গোলাম হোসেন নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন, ছিনতাই করা কার্ড ব্যবহার করে বিকাশ মার্চেন্টে টাকা স্থানান্তরের মূল কারসাজিটি তিনিই করেছিলেন।
ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি ছোরা ও ছিনতাই কাজে নিয়োজিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি ইতিমধ্যে জব্দ করেছে পুলিশ।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবির ও চাক্তাই ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোবারক হোসেন এই সফল অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রিদোয়ান বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখসহ বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে বলে জানায় পুলিশ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

